|
স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীসহ সারা দেশে খুন, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরনও। আগে পেশাদার খুনিরা অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটালেও সমপ্রতি উঠতি বয়সের কিশোর-তরুণরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অবস'া এমন দাঁড়িয়েছে যে রাজধানীর ৪২ থানা এলাকার ৫১৬ জন কিশোর অপরাধীদের পৃথক একটি তালিকা পর্যন- তৈরি করেছে পুলিশ। তবে এখনো এদের কেউ ধরা পড়েনি। আর পেশাদারদের ছাপিয়ে উঠতি কিশোর-তরুণ-যুবকরা অপরাধের পথে পা বাড়ানোয় পরিসি'তি সমাল দেয়াও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করছেন। অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পরিবারের নজরদারির অভাবে এসব কিশোর-যুবকরা বখে যাচ্ছে। অবশ্য গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করছেন, মাদকদ্রব্যের কবলে পড়ে বখে যাওয়া কিশোর-তরুণরাই অপরাধের পথে পা রাখছে। জানা গেছে, গত শনিবার সকালে কলাবাগানে ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলামের কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করেছিল তার মেয়ে ফৌজিয়া বৃষ্টির প্রেমিক আশরাফ। দাবিকৃত টাকা না পেয়ে আশরাফ বৃষ্টি ও তার বাবা-মাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে। বৃষ্টি ও আশরাফধানমণ্ডির ডিআইআইটি ইঞ্জিনিয়ারস ইনিস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে পড়ে। এর আগে গত শুক্রবার খিলড়্গেতের চামড়ারটেকে গার্মেন্টসকর্মী আশার ব্যর্থ প্রেমিক সেলিম সন্ত্রাসী ভাড়া করে আশার প্রেমিক হৃদয় ওরফে পাপ্পুকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। গত বুধবার গুলশান কালাচাঁদপুরে ব্যবসায়ী সাদিকুর রহমানের কন্যা ইতির ব্যর্থ প্রেমিক রুবেল বিয়ের প্রস-াব প্রত্যাখ্যান করায় বাসায় ঢুকে সাদিকুর ও তার স্ত্রী রুমানা নার্গিসকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। গত ১৬ মার্চ আরামবাগে মাত্র ২ কেস পানির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ইলিয়াছ ও সুফিয়ান নামে দুজন খুন হয়েছে। এসএ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার রবিন জোড়া খুন করার পরও দিব্যি অফিস করেছে, পুলিশ-র্যাব ও গোয়েন্দাদের মুখোমুখি হলেও তার চেহারায় অপরাধের কোনো ছাপাই ছিল না! গত সপ্তাহে নন্দীপাড়ায় ১০ নরপশু গণধর্ষণ করেছে এক তরুণীকে। গত ৪ মার্চ রিমান্ডে থাকা সন্ত্রাসী নান্টুর নির্দেশে খুন হয়েছেন পুরান ঢাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রেমকৃষ্ণ। এছাড়া গত এক মাসে অত্যাধুনিক কয়েকটি অস্ত্রের চালানসহ র্যাবের হাতে ধরা পড়েছে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এ ধরনের অপরাধ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রভাষক নাজমা খাতুন বলেছেন, এখন পরিসি'তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বাচ্চারা পর্যন- খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়ছে। মরাল ব্যালেন্স কমে যাওয়ার কারণে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। অনেক পরিবারের কিশোর-যুবকরা পরিবার থেকে বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছে। এর থেকেও তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে অপরাধ প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তিনি আরো বলেন, সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে যেমন স্বাধীনতার প্রয়োজন তেমনিভাবে অতিরিক্ত স্বাধীনতা উঠতি বয়সীদের বিপথগামী করতে সহায়তা করে থাকে। স্বাধীনতার সুফল-কুফল বুঝতে না পেরে তারা ইন্টারনেটে যা পাচ্ছে তাই নিজের কালচার মনে করছে। এসব থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে নাজমা খাতুন বলেন, এসব অপরাধের ঘটনায় কেউ একদিনেই জড়িয়ে পড়ে না। ধীরে ধীরে তারা অপরাধপ্রবণ হচ্ছে, এজন্য পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, কিশোর, তরুণ, যুবকদের বোঝাতে হবে জীবনের মানে কী, নিজেকে ভালোবাসলেই হবে না, অন্যকেও ভালোবাসতে হবে। এ ধরনের অপরাধের মাত্রা কমিয়ে আনতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। পরিবার থেকে সন-ানদের টেকওভার করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। নাজমা খাতুন মনে করেন, বাচ্চাদের চাওয়ার আগেই সব পাওয়ার খেসারত হিসেবে এক পর্যায়ে তারা পরিবারের নিয়ন্ত্রণ ও গণ্ডির বাইরে চলে যায়, বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, পেশাদারদের বাইরে প্রতিদিনই নতুন মুখ নতুন সব অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। যে কারণে পুলিশ পেরে উঠছে না। এখন এরাই আইনশৃঙ্খলা পরিসি'তি অবনতির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সিআইডির একজন বিশেষ সুপার বলেছেন, মাদকের সহজলভ্যতার কারণে উঠতি কিশোর-তরুণ-যুবকরা প্রথমে শখের বসে নেশা সেবন করছে, পরে তারা আসক্ত হয়ে পড়ছে। এক পর্যায়ে অনেক ভালো পরিবারের সন-ানরা- বখাটেদের সংস্পর্শে যাচ্ছে, নেশার টাকা জোগাড় করতে তারাও অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছে। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি।
|